News Headline :
গণভোটে অর্ধেক ‘না’ ভোট, ৯ শতাংশ বাতিল নাটোরে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত ১৩, বিএনপি নেতাসহ চারজন গ্রেপ্তার নড়াইলে বিএনপি-স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে নারীসহ আহত ২০ চরফ্যাশনে সন্তানদের জিম্মি করে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ, টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট বগুড়ায় বোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় ভাইকে ছুরিকাঘাতে হত্যা নাটোরে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত ৬ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাকে হারানো হয়েছে : আমিনুল হক আশুলিয়ায় নির্বাচনের পরের দিন পরিবহনে চাঁদাবাজি, গণধোলাই দিল জনতা পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খোলা বিএনপি নেতা বললেন, সেটি গুদামঘর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ কবে, জানালেন শফিকুল আলম
আশিক চৌধুরীর বিনিয়োগের ফাঁপা বেলুন!

আশিক চৌধুরীর বিনিয়োগের ফাঁপা বেলুন!

দেখতে দারুণ স্মার্ট, সুদর্শন। উচ্চশিক্ষিত। ইংরেজিতেও বেশ পটু। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরই তাঁকে বিদেশ থেকে ‘হায়ার’ করে আনা হলো।

সবাই বলছিল, খরা কাটিয়ে বিনিয়োগে দেশকে ভাসিয়ে দেবেন এই তরুণ। নাম তাঁর আশিক চৌধুরী।

বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ—বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান। বড় বাজেটের বিরাট বিদেশি বিনিয়োগ সম্মেলন করলেন।

দিন যায়, মাস যায়। বিনিয়োগ আর আসে না। কারণ নিরাপত্তাহীনতা, হামলা-মামলা, আস্থাহীনতায় তখন দেশের বিনিয়োগকারীরাই হতাশ, ক্ষুব্ধ, বিধ্বস্ত। ব্যাংক খাতে ইমেজ সংকট।বেশ কিছু ব্যাংকের ললাটে ‘দেউলিয়ার’ তকমা। বিনিয়োগ তো দূরের কথা, দেশি ব্যবসায়ী-বিনিয়োগকারীরা পুঁজি ধরে রাখতেই মরিয়া। হাত-পা গুটিয়ে সবাই ‘রাজনৈতিক সরকারের’ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। দেড় বছর শেষ। আশা-জাগানিয়া মেধাবী আশিক চৌধুরীর হাত ধরে দেশের বিনিয়োগের ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি।

উল্টো দেশের বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া নিয়ে বিতর্ক তাঁকে তাড়া করছে। তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এমন চিত্রই দেখা যায়। বিনিয়োগের অন্যতম সূচক হিসেবে ধরা হয় বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এফডিআই তথ্য এবং শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির প্রবণতা। এই তিন সূচকই বলছে, বিনিয়োগ পরিবেশে কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো আসেনি। বরং নতুন বিনিয়োগ নিম্নমুখী, মূলধনী যন্ত্র আমদানি কমছে, আর বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও থমকে আছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট এফডিআই বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলারে পৌঁছলেও এই বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিদ্যমান বিদেশি কম্পানির পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ থেকে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বা ইকুইটি ক্যাপিটাল এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। করোনাকালেও নতুন বিনিয়োগ এর চেয়ে বেশি ছিল। অর্থাৎ সংখ্যায় নিট এফডিআই বাড়লেও বাস্তবে নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন কমেছে।

বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধনের চিত্রও একই রকম। অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিডায় নিবন্ধিত মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ছিল ৬৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনাকালে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। বিদায়ি অর্থবছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। তার আগের বছরে এটি ছিল ৩২ হাজার কোটি টাকার। অন্যদিকে গত অর্থবছরে ৫২ হাজার কোটি টাকার দেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়। তার আগের বছর নিবন্ধিত হয় এক লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকার।

যদিও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলছেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশগুলোতে সাধারণত এফডিআই নেতিবাচক হয়ে পড়ে, সেখানে বাংলাদেশে নিট বিনিয়োগ বেড়েছে, যা এক ধরনের ‘মিরাকল’। তাঁর মতে, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে এফডিআই ৮০ শতাংশ বেড়েছে। বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে, চীন ও সিঙ্গাপুর প্রধান উৎস।

তবে বৃহত্তর চিত্রে বিনিয়োগ পরিস্থিতি যে চাপে রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ছিল ২৩.৫১ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে এসেছে ২২.৪৮ শতাংশে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৯ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের শেষ সময়েও তা ছিল ১০ শতাংশের বেশি। শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থান হ্রাসের ঘটনাও বাড়ছে।

আশিক চৌধুরী দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন এবং ব্যাবসা পরিচালনার সহজতা ও দুর্নীতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এফডিআই হিটম্যাপ প্রকাশ করে তথ্যভিত্তিক বিনিয়োগ কৌশলের কথা জানান। এপ্রিল মাসে আয়োজিত চার দিনের বিনিয়োগ সম্মেলনে ৫০টি দেশের চার শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন। সম্মেলন শেষে প্রায় তিন হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি প্রশংসাও কুড়ায়। অনেকেই তখন ‘আশিক ম্যাজিক’-এর কথা বলতে শুরু করেন। অন্যদিকে তখন এমন আলোচনাও হয় যে এখন দেশের বেসরকারি খাতের অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাঁরা একাই তিন-চার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সক্ষম। অথচ তাঁদেরকে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে আহ্বান করা হয়নি।

বিনিয়োগ প্রস্তাব যা-ই হোক, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। দেশি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রাজনৈতিক সরকারের অনুপস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে আছে। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গেও আলোচনায় বিনিয়োগ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা মিলছে না। একাধিক বিনিয়োগকারী জানান, বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে নির্বাচিত সরকার ও স্থিতিশীলতা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসা কঠিন।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভাষ্যও একই। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের মতে, দেশে ব্যাংকঋণের সুদহার ১৫ শতাংশের বেশি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয় উচ্চ, পরিবহন খরচ ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রকট। এই পরিস্থিতিতে বিদেশিরা কেন বিনিয়োগ করবে? স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই যখন পিছিয়ে, তখন বিদেশিদের আগ্রহ আশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।

বিডার নিবন্ধন পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রকল্প ছিল এক হাজার ১১৩টি, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তা নেমে এসেছে ৮১৪টিতে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যদিও বিডার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতে অনেক ভুয়া বা অকার্যকর নিবন্ধন হতো, সেগুলো বন্ধ করায় সংখ্যা কমেছে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা তৈরি হলেই পুরো চক্র থমকে যায়। তাঁর মতে, জমি পাওয়া গেলেও মানসম্মত বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত গ্যাস নেই, ব্যাংকঋণের সুদহার অত্যন্ত বেশি, ব্যবসার খরচ কমেনি। গ্যাস সংকট নিরসনে বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি, সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ডিজিটাইজেশনও সীমিত। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার সময় কমানোর কার্যকর উদ্যোগের অভাবও বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহ করছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যেখানে পেয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের এফডিআই, সেখানে ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন ও ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। দুই বছর আগেও যে দেশটি বাংলাদেশের পেছনে ছিল, এখন সেখানে এগিয়ে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমলাদের বাইরে থেকে একজনকে বিডার নেতৃত্বে আনা হয়েছিল সাহসী সংস্কারের আশায়। কিন্তু গত দেড় বছরে বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। উদ্যোগ ছিল, কর্মস্পৃহাও ছিল; কিন্তু সেগুলোকে পরের ধাপে নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে আশিক চৌধুরীর তৎপরতার একটি বড় অংশ ঘিরে রয়েছে বন্দর, লজিস্টিকস ও বড় অবকাঠামো চুক্তি। সমালোচকরা মনে করেন, নীতিগত সংস্কার ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নতির চেয়ে ‘হাই-ভ্যালু ডিল’ এবং চমকপ্রদ ঘোষণায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগ প্রচারণা যতটা গর্জন করেছে, বাস্তবে বর্ষণ ততটা হয়নি।  

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




AF themes

Build Your Website in Minutes with One-Click Import – No Coding Hassle! 1000+ Expert Starter Sites & Templates for Stunning Newspaper, Magazine, Blog, and Publishing Websites.

We mainly focus on quality code and elegant design with incredible support. Our WordPress themes and plugins empower you to create an elegant, professional, and easy-to-maintain website in no time at all.

© All rights reserved © 2017 SpacialNews
Design & Developed BY ThemesBazar.Com